“প্রিয় চারুলতা - একটি অসমাপ্ত গল্প” পর্ব - ১২
চারুলতার উত্তর
কে এম মন্জুর হোসেন খান ||
যদি চারুলতা কোনোদিন,
তার নীরবতার ভাষা খুলে বলত,
হয়তো তার উত্তরটা এমনই হতো—
“তুমি ভেবেছিলে
আমি বুঝিনি কিছুই,
তোমার চোখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা
সেই অগোছালো কথাগুলো।
আসলে বুঝেছিলাম।
শুধু বুঝেও
কখনো জিজ্ঞেস করিনি।
কারণ, কিছু অনুভূতির নাম
জেনে ফেললে,
তাদের স্বাভাবিক সৌন্দর্যটা
কেমন যেন বদলে যায়।
তুমি যখন চুপ করে থাকতে,
আমি সেই নীরবতার ভেতরেও
অনেক শব্দ শুনতাম।
তোমার অকারণ হাসি,
হঠাৎ থেমে যাওয়া কথা,
চোখ ফিরিয়ে নেওয়া—
এসব কি সত্যিই
কিছু না বলার ভাষা ছিল?
হয়তো ছিল।
কিন্তু আমিও তো
তখন খুব অল্প জানতাম জীবনকে।
তাই প্রশ্ন করার বদলে,
চুপ করে থাকাই সহজ মনে হয়েছিল।
তারপর একদিন,
আমাদের মাঝখানে-
একটি ভুল বোঝাবুঝি এসে দাঁড়াল।
আমি ভেবেছিলাম,
তুমি আর আগের মতো নেই।
তুমিও হয়তো ভেবেছিলে,
আমি তোমাকে বুঝতে চাই না।
কেউ কাউকে
একবারও জিজ্ঞেস করিনি—
‘সত্যিটা কী?’
এই না-জিজ্ঞেস করাটাই,
হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।
তারপর সময় চলে গেল।
প্রথমে- দিন,
তারপর মাস,
তারপর বছর।
ভাবতাম,
পুরোনো সবকিছু,
হয়তো একদিন,
নিজে থেকেই মুছে যাবে।
কিন্তু কিছু স্মৃতি,
মুছে যায় না।
তারা শুধু-
মনের খুব গভীরে,
চুপ করে বসে থাকে।
হঠাৎ কোনো বিকেলে,
কোনো পরিচিত সুরে,
কোনো পুরোনো রাস্তার গন্ধে,
অথবা অকারণে,
একটি নাম মনে পড়লে
তারা আবার ফিরে আসে।
তোমার নামও
তেমন করেই ফিরে এসেছে
অনেকবার।
তারপর একদিন,
তোমার বার্তা পেলাম।
স্ক্রিনে তোমার নাম দেখে
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
ভাবছিলাম—
এত বছর পর
কী লিখব?
অভিমান?
অভিযোগ?
নাকি শুধু,
একটি সাধারণ ‘হ্যাঁ’?
শেষ পর্যন্ত,
সেই ছোট্ট শব্দটাই লিখেছিলাম।
‘হ্যাঁ।’
হয়তো তুমি জানো না,
সেই একটি শব্দ লেখার আগে,
আমার ভেতরেও
অনেক কথা হয়েছিল।
কিন্তু সব কথা
লিখে পাঠানো যায় না।
কিছু কথা
শুধু নিজের কাছেই রাখা যায়।
তারপর তোমার কণ্ঠস্বর
আবার শুনলাম।
বছরগুলো যেন
এক মুহূর্তের জন্য,
পেছনে ফিরে গেল।
তবু আমি জানতাম—
আমরা আর আগের জায়গায় নেই।
আমাদের জীবন বদলেছে,
আমাদের পথ বদলেছে,
আমাদের চারপাশের পৃথিবী
অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
তাই পুরোনো দিনের দরজায়
দাঁড়িয়ে থেকে,
নতুন কোনো দাবি করতে চাইনি।
শুধু মনে হলো—
কিছু সম্পর্কের শেষটাও
হয়তো সুন্দর হতে পারে।
কিছু মানুষকে,
আবার কাছে পাওয়ার প্রয়োজন নেই,
তাদের শুধু
ভালোভাবে মনে রাখাই যথেষ্ট।
তুমি যদি জানতে চাও—
তোমাকে কি কখনো মনে পড়েছে?
হ্যাঁ, পড়েছে।
কখনো খুব নিঃশব্দে,
কখনো কোনো কারণ ছাড়াই।
কিন্তু সেই স্মৃতির সঙ্গে
আমি কোনো প্রত্যাশা জুড়ে দিইনি।
শুধু ভেবেছি—
জীবনে কিছু মানুষ আসে
থেকে যাওয়ার জন্য নয়,
একটি সময়কে
সুন্দর করে দেওয়ার জন্য।
তুমিও হয়তো
আমার জীবনের তেমনই
একটি অধ্যায়।
যে অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে,
তবু যার পাতাগুলো
ফেলে দিতে ইচ্ছে করে না।
তাই যদি কোনোদিন
আবার দেখা হয়,
পুরোনো প্রশ্ন নিয়ে এসো না।
এসো একজন পরিচিত মানুষ হয়ে।
আমি হয়তো
হেসে বলব—
‘কেমন আছো?’
তুমিও বলবে—
‘ভালো আছি।’
এইটুকুই যথেষ্ট।
কারণ সব গল্পের
শেষে, একসঙ্গে থাকা লেখা থাকে না।
কিছু গল্পের শেষ পাতায়
শুধু লেখা থাকে—
‘ভালো থেকো।’
আর কিছু গল্প
শেষ হয় না কখনো।
তারা থেকে যায়,
দুজন মানুষের স্মৃতির ভেতর,
দুটি আলাদা জীবনের,
দুটি নীরব জানালায়।
তুমি তোমার পথে থেকো,
আমি আমার পথে।
তবু যদি কোনো এক সন্ধ্যায়,
হঠাৎ, পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে,
তবে এটুকু জেনে রেখো—
তোমার বলা কথাগুলোই শুধু
আমি মনে রাখিনি,
তোমার না-বলা কথাগুলোকেও
একদিন নীরবে বুঝেছিলাম।
এটাই হয়তো
আমার উত্তর।
আর এই উত্তরটুকুই
এতদিন পরেও,
আমাদের অসমাপ্ত গল্পের
সবচেয়ে নীরব সত্য।”
=======“চারুলতার উত্তর”=======

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন