২৭ আগস্ট, ২০২৬

আবার সেই কণ্ঠস্বর - কে এম মন্জুর হোসেন খান

 “প্রিয় চারুলতা - একটি অসমাপ্ত গল্প” পর্ব - ৯

আবার সেই কণ্ঠস্বর
কে এম মন্জুর হোসেন খান ||
আবার সেই কণ্ঠস্বর - কে এম মন্জুর হোসেন খান | Onuvutir Kobita "অনুভূতির কবিতা"

চারুলতা,
কিছু কণ্ঠস্বর আছে—
বছরের পর বছর না শুনলেও
হৃদয় তাদের চিনে রাখে।

সেদিনও তাই হয়েছিল।

দিনটা ছিল অন্য দিনের মতোই,
ব্যস্ততায় ভরা,
নিজের মতো করে চলছিল সময়।

হঠাৎ ফোনের পর্দায়
তোমার নামটি ভেসে উঠল।

এক মুহূর্তে
চারপাশের সব শব্দ
কেমন যেন দূরে সরে গেল।

আমি শুধু তাকিয়ে রইলাম।

তুমি ফোন করেছ!

এত বছর পর!
কোনো পূর্বাভাস ছাড়া,
কোনো প্রস্তুতি ছাড়া,
হঠাৎ।

মনে হলো,
সময়ের দরজা কেউ যেন
এক ঝটকায় খুলে দিয়েছে,
আর ওপাশ থেকে
পুরোনো দিনের বাতাস এসে
আমাকে ছুঁয়ে গেল।

ফোনটা ধরতে
কতটা সময় লেগেছিল জানি না।

শুধু মনে আছে,
ওপাশ থেকে তোমার কণ্ঠ ভেসে এলো—

“হ্যালো...”

একটি সাধারণ শব্দ।

কিন্তু আমার কাছে
সেটি ছিল, বহু বছর পর-
শোনা কোনো প্রিয় গানের
প্রথম সুরের মতো।

আমি কিছুক্ষণ
কথা খুঁজে পেলাম না।

কী বলব?

“কেমন আছো?”
নাকি-
“এতদিন পর ফোন করলে কেন?”

শেষ পর্যন্ত
সাধারণ কথাতেই শুরু হলো সব।

কেমন আছো,
কোথায় আছো,
কেমন কাটছে দিন—
কত সাধারণ প্রশ্ন!

তবু প্রতিটি প্রশ্নের
পেছনে যেন লুকিয়ে ছিল
অনেক বছরের অজস্র গল্প।

তুমি কথা বলছিলে,
আর আমি শুনছিলাম।

তোমার কণ্ঠে
সময়ের ছাপ ছিল,
তবু কোথাও যেন
সেই পুরোনো চারুলতাকে
খুঁজে পেলাম।

মনে হচ্ছিল,
আমি আবার সেই দিনগুলোর কাছে
ফিরে গেছি—
যেখানে কথার কোনো শেষ ছিল না,
অথচ সময় ছিল খুব কম।

কথা বাড়তে বাড়তে
কখন যে পুরোনো দিনের দরজা খুলে গেল,
টেরই পেলাম না।

মনে পড়ল
সেই প্রথম দেখা,
সেই বিকেলের কথা,
সেই হাসি,
সেই ছোট ছোট অভিমান।

কিছু স্মৃতি নিয়ে
আমরা দুজনেই হাসলাম।

কিছু স্মৃতির কাছে এসে
দুজনেই একটু চুপ হয়ে গেলাম।

সেই নীরবতাগুলো
অদ্ভুত পরিচিত ছিল।

মনে হলো,
বছরের পর বছর দূরত্ব
আমাদের কণ্ঠের মাঝখানে
যতটুকু দেয়াল তুলেছিল,
কথার কয়েকটি স্রোতেই
সেটুকু ভেঙে যাচ্ছে।

তুমি কি বুঝেছিলে?

জানি না।

কিন্তু আমি বুঝেছিলাম—
কিছু সম্পর্ককে
সময় মুছে দিতে পারে না।

শুধু একটু দূরে সরিয়ে রাখে।

সেদিন আমাদের কথা
কতক্ষণ চলেছিল,
আজ আর মনে নেই।

শুধু মনে আছে—
ফোন রাখার পরও
অনেকক্ষণ তোমার কণ্ঠ
আমার চারপাশের নীরবতায়
ভেসে বেড়াচ্ছিল।

মনে হচ্ছিল,
তুমি ফোন রাখোনি—
শুধু একটু চুপ করে আছো।

আর আমি
সেই নীরবতাটুকুও শুনছি।

সেদিন রাতে
ঘুম আসতে অনেক দেরি হয়েছিল।

বারবার মনে হচ্ছিল—

“এত বছর পরও
তোমার কণ্ঠে
আমার জন্য কি কোনো পুরোনো সুর
রয়ে গেছে?”

আমি উত্তর জানি না।

জানতে চাইও না।

কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর
পেয়ে গেলে
হয়তো তাদের মায়াটা নষ্ট হয়ে যায়।

আমি শুধু চাই—
কখনো কখনো
আবার তোমার ফোন আসুক।

কোনো বিশেষ কারণ ছাড়া।

শুধু বলতে—

“কেমন আছো?”

আর আমি
হেসে উত্তর দিই—

“ভালো আছি, চারুলতা।”

তারপর আবার
কথা জমুক।

পুরোনো দিনের মতো নয়,
নতুন কোনো দিনের মতো।

কারণ আমরা তো
আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারব না।

কিন্তু, হয়তো,
একটি নতুন জায়গা থেকে
আবার কথা শুরু করতে পারি।

চারুলতা,
সেদিন তোমার ফোন
শুধু একটি ফোন ছিল না।

সেটি ছিল
বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা
একটি জানালা খুলে যাওয়ার শব্দ।

আর সেই জানালা দিয়ে
যে বাতাসটি এসেছিল,
তার নাম ছিল—

স্মৃতি।

তার সঙ্গে মিশে ছিল
তোমার কণ্ঠস্বর।

আর আমার বুকের ভেতর
নিঃশব্দে ফিরে এসেছিল
একটি পুরোনো বিকেল।

=======“আবার সেই কণ্ঠস্বর”=======

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Pages