“প্রিয় চারুলতা - একটি অসমাপ্ত গল্প” পর্ব - ১৩
অসমাপ্ত চিঠি
কে এম মন্জুর হোসেন খান ||
প্রিয় চারুলতা,
এই চিঠিটা তোমার কাছে
কখনো পৌঁছাবে না—
জেনেও লিখতে বসেছি,
কারণ কিছু কথা আছে
যেগুলো কাউকে পাঠানোর জন্য নয়,
শুধু বুকের ভেতর থেকে
একবার কাগজে নামিয়ে রাখার জন্য।
জানি না,
এই মুহূর্তে তুমি কোথায়,
কী নিয়ে ব্যস্ত,
কোন জানালার পাশে বসে
তোমার নিজের পৃথিবী দেখছ।
শুধু জানি,
আমার স্মৃতির ভেতর
তুমি এখনো সেই মানুষটি,
যার সঙ্গে কথা শেষ হওয়ার পরও
অনেক কথা বাকি থেকে যেত।
মনে আছে কি, চারুলতা—
সেই প্রথম দেখা?
চোখে চোখ পড়েছিল,
অথচ কেউ কিছু বলিনি।
সেই নীরব মুহূর্তটুকু
কীভাবে যেন
এত বছরের একটি গল্প হয়ে গেল।
তারপর এসেছিল
কত বিকেল,
কত হাসি,
কত সাধারণ কথোপকথন—
যেগুলো তখন খুব সাধারণই মনে হয়েছিল,
আজ সেগুলোই
সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি।
তোমাকে একটা কথা
তখন বলা হয়নি।
বলতে চেয়েছিলাম—
তোমার উপস্থিতি
আমার দিনগুলোকে
কেমন যেন একটু সুন্দর করে দেয়।
কিন্তু কথাটা
ঠোঁট পর্যন্ত এসে
আবার ফিরে গিয়েছিল।
তারপর একদিন
একটি ভুল বোঝাবুঝি
আমাদের মাঝখানে
দীর্ঘ নীরবতা এনে দিল।
আমরা কেউই
ঠিক করে জানতে চাইনি
কী ঘটেছিল।
তুমি তোমার মতো
চুপ করে গেলে,
আমিও আমার অভিমান
নিজের কাছে রেখে দিলাম।
তারপর সময়—
সে তো কারও জন্য অপেক্ষা করে না।
বছর পেরিয়ে গেল,
ঋতু বদলে গেল,
জীবন তার নিজের নিয়মে
অনেক দূর এগিয়ে গেল।
শুধু মাঝে মাঝে
কোনো এক নির্জন বিকেলে
তোমার নামটা
অকারণে মনে পড়ে গেল।
তখন বুঝলাম—
দূরত্ব মানেই বিস্মৃতি নয়।
কিছু মানুষ
দূরে গিয়েও
মনের ভেতর
অদ্ভুতভাবে কাছে থেকে যায়।
অনেক বছর পর
যখন আবার তোমার সঙ্গে
কথা হলো,
মনে হলো—
পুরোনো কোনো দরজা
আস্তে করে খুলে গেছে।
তোমার ছোট্ট একটি “হ্যাঁ”,
তারপর তোমার কণ্ঠস্বর—
কত সামান্য ঘটনা!
তবু আমার স্মৃতির শহরে
সেদিন যেন
অনেক পুরোনো আলো জ্বলে উঠেছিল।
আমি তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম—
“চারুলতা,
তোমাকে আমি ভুলে যাইনি।”
কিন্তু বলা হয়নি।
বলতে চেয়েছিলাম—
“যে কথাগুলো একদিন
ভুল বোঝাবুঝির ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছিল,
তাদের জন্য আজও
একটু আফসোস রয়ে গেছে।”
সেটাও বলা হয়নি।
আর সবচেয়ে বেশি
যে কথাটি বলতে চেয়েছিলাম—
“তোমার জীবনে আমার কোনো দাবি নেই,
শুধু চাই,
আমাদের পুরোনো গল্পটাকে
অভিমান দিয়ে নয়,
একটু মায়া দিয়ে মনে রেখো।”
সেটিও বলা হলো না।
তাই এই চিঠি।
যে চিঠির কোনো ঠিকানা নেই,
কোনো ডাকটিকিট নেই,
কোনো খাম নেই।
শুধু আছে
কিছু পুরোনো স্মৃতি,
কিছু না-বলা কথা,
আর একটি নাম—
চারুলতা।
হয়তো কোনোদিন
এই চিঠি তোমার হাতে যাবে না।
হয়তো কোনোদিন
তুমি জানবেও না
কত কথা লিখে
আমি আবার মুছে দিয়েছিলাম।
তবু ক্ষতি কী?
কিছু চিঠি
পাঠানো না হলেও
তাদের অস্তিত্ব বৃথা যায় না।
তারা সাক্ষী হয়ে থাকে—
একটি সময়ের,
একটি সম্পর্কের,
একটি ভুল বোঝাবুঝির,
আর কিছু অনুভূতির
যাদের কোনোদিন
সম্পূর্ণ ভাষা খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তাই শেষ করার আগে
শুধু এটুকুই লিখি—
চারুলতা,
তুমি যেখানে থাকো, ভালো থেকো।
আমাদের গল্পের
যে পাতাগুলো লেখা হয়নি,
সেগুলো আর লিখতে হবে না।
যে কথাগুলো বলা হয়নি,
সেগুলোও হয়তো
নীরব থাকুক।
শুধু পুরোনো কোনো বিকেলে
যদি হঠাৎ আমার কথা মনে পড়ে,
তবে ভেবো—
কেউ একজন
তোমার জীবনে এসে
কিছুটা সময়
স্মৃতি হয়ে থেকে গিয়েছিল।
এইটুকুই তার গল্প।
এইটুকুই তার চিঠি।
আর এই চিঠির শেষ লাইনে
কলম থেমে গেলেও—
গল্পটা থামল না।
কারণ কিছু চিঠি
শেষ হয় না কখনো;
তারা শুধু
পাঠানো হয় না।
=======“অসমাপ্ত চিঠি”=======

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন